আজ মঙ্গলবার বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। সারা দেশে যখন 'সবার জন্য স্বাস্থ্য' নিশ্চিতের স্লোগান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তখন পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে চিত্রটা ঠিক উল্টো। যদি প্রশ্ন করা হয়-বাংলাদেশের মানচিত্রে এমন কোনো উপজেলা আছে কি, যেখানে আজ পর্যন্ত একটি সরকারি হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়নি? কিংবা নেই একজনও সরকারি এমবিবিএস চিকিৎসক? তবে এর উত্তর দিতে গিয়ে সবাই একবাক্যে আঙুল তুলবেন পটুয়াখালীর ‘রাঙ্গাবালী’র দিকে।
প্রশাসনিকভাবে উপজেলা ঘোষণার ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সাগরবেষ্টিত এই দ্বীপ জনপদের দুই লাখ মানুষের কাছে আধুনিক চিকিৎসাসেবা আজও এক অলীক স্বপ্ন।
২০১২ সালে উপজেলা হিসেবে কার্যক্রম শুরু হলেও এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এখনো রাঙ্গাবালীতে কার্যক্রম শুরু হয়নি একটি সরকারি হাসপাতালের।
সংশ্লিষ্টরা জানান, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে চারটিতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, একটিতে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ১২টি ওয়ার্ডে কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেখানে কেবল জ্বর, সর্দি ও কাশির মতো সাধারণ রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা মেলে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় জটিল কোনো রোগের চিকিৎসা এখানে অসম্ভব। স্থানীয় ৩-৪টি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকলেও সেখানে সেবার মান অত্যন্ত অপ্রতুল।
এই উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবা কতটা করুণ, তার চিত্র ফুটে ওঠে তিন মাস বয়সী শিশু জাহিদের পরিবারে। ঠান্ডা-জ্বরে ভোগা শিশুটিকে নিয়ে রোববার সকালে বাবা বেল্লাল গাজী ও মা সুমাইয়া আক্তার উত্তাল আগুনমুখা নদী পাড়ি দিয়ে গিয়েছিলেন পটুয়াখালীর এক হাসপাতালে। সোমবার দুপুরে কোড়ালিয়া লঞ্চঘাটে এই দম্পতির সঙ্গে কথা হয়। তারা আক্ষেপ করে বলেন, 'হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে ভর্তি দিলেও রোগীর চাপে শিশু সুস্থ হওয়ার চেয়ে আরও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিল।' শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে তারা বাড়ি ফিরে আসেন। এখন বাড়িতে বসেই সন্তানের সুস্থতা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামের রাসেল মাহমুদ। তার ৫ মাস বয়সী শিশু ঠান্ডা-জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলেও নদীপথের অবর্ণনীয় ভোগান্তি এড়াতে তিনি দূরের হাসপাতালে যেতে পারেননি। রাঙ্গাবালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামান্য প্রাথমিক চিকিৎসায় এখন তিনি ভরসা রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, 'দ্রুত সময়ের মধ্যে এই উপজেলায় হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু আমাদের প্রাণের দাবি।'
সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটে পড়েন গর্ভবতী নারীরা। কোড়ালিয়া গ্রামের টুম্পা রানী বলেন, 'জরুরি চিকিৎসা নিতে গিয়ে পথেই অনেক প্রসূতি মা ও গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার ঘটনা এখানে নিয়মিত। সন্ধ্যার পর নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে কোনো সংকটাপন্ন রোগীকে অন্য উপজেলায় নেওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল নদী পাড়ি দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না।'
রাঙ্গাবালীবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে ২০২৩ সালে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু ৫০ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হওয়ার পর ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে রহস্যজনক কারণে কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'দেশে এমনও উপজেলা আছে, যেখানে এক যুগেও একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হয়নি—এটি অবিশ্বাস্য। স্বাস্থ্যসেবা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি আমাদের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার।'
রাঙ্গাবালীর দায়িত্বে থাকা গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মেজবাহ উদ্দিন বলেন, 'চতুর্থ এইচপিএনএসপি প্রকল্পের আওতায় ৫০ শয্যা বিশিষ্ট রাঙ্গাবালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। মাঝপথে তা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তবে সম্প্রতি প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে এবং দরপত্র আবেদন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।'
এ ব্যাপারে গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (রাঙ্গাবালীর অতিরিক্ত দায়িত্বে) মাহমুদুল হাসান বলেন, 'রাঙ্গাবালীর মানুষের গলাচিপা বা পটুয়াখালী গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। সংবিধানে স্বাস্থ্যসেবা মৌলিক অধিকার, সেটি নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। নির্মাণাধীন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে তাগিদ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মহোদয়।'
কামরুল হাসান